সাংবাদিকতার দৌরাত্ম্য কতদূর

প্রকাশিত: ৬:৫৯ অপরাহ্ণ , সেপ্টেম্বর ৫, ২০২২

কামাল পারভেজ

সাংবাদিক শব্দটি নব্বই দশকের আগেও ছিলো পৃথিবীর সবচাইতে একটা মহান ও সম্মানের স্হান। নিচের স্তর থেকে উপর মহল মানে রাষ্ট্রের প্রথম স্তম্ভ দায়িত্বে থাকা মানুষগুলো কাছে সাংবাদিকতার পেশার লোকটাও তাঁর, চাইতেও মহামূল্যবান মানুষ হিসেবে ভাবতো। যদি বলা হতো আপনার একটা সাক্ষাতকার নেওয়া হবে তাতে আদর আর কদরের একটু কমতি ছিলোনা। অতি আগ্রহে বসে থাকতেন সাংবাদিক বাসায় আসছে সাক্ষাতকার নিতে। ঐ সাংবাদিক কতো টাকা বেতন /সম্মানী পেতো তাতে কিচ্ছু যায় আসেনা। ছোট /বড়, সাপ্তাহিক /দৈনিক পত্রিকায় কাজ করছে সেটাও দেখার বিষয় ছিলোনা। হ্যাঁ, দেখার বিষয় একটা তার সততা। তখনকার সময় একজন সাংবাদিক এতো কম সম্মানী পেয়েও তার জীবন যুদ্ধের কাছে হার মানেননি। অথচ বর্তমান সময়ে যেসব পত্রিকায় সম্মানী/বেতন দেন সেখানেই কর্মরত অনেক সাংবাদিক ওয়েজবোর্ড নামক শব্দের বাহিরে তিনগুণ সম্মানী নিয়ে যান তাঁর বাহিরে গিয়ে নীতি পরিবর্তন করে অঢেল সম্পত্তির মালিক বুনে যাচ্ছে। সেকালের সাংবাদিক একালের সাংবাদিকতা ফারাকটা আকাশ পাতালের চাইতো চারগুণ ব্যবধান হয়ে পড়েছে। সেকালের গণমাধ্যম শব্দের আলোকধারা বহনকারী হিসেবে প্রাধান্য পেতো, নিচ তলা থেকে যত উপরের উঁচু তলা গণনা করা হোকনা কেন গণমাধ্যম কর্মীর দৌরাত্ম ছিলো তাঁর চাইতো বেশি আর সেটা হলো তাঁর সততা ও নীতি। বিসর্জ্জন শব্দের উর্ধ্বে থাকার চেষ্টাই চলতো একজন সাংবাদিকের। আজ সে অবস্থান থেকে নিচে নামতে নামতে গ্রান্ড ফ্লোরের তলায় গিয়ে নীতি বিসর্জ্জনের দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছি। যে যতো বেশি পা’চাটা হতে পারি ততই বেশি লাভবান হবো। কথায় আছে “গরু (গাভী) লাথি মারলে কি হবে দুধতো বেশি পাবো” বর্তমান সময়ে ৯০ শতাংশ গণমাধ্যম কর্মীদের এই মনোভাব। পিছনের দিকে যদি আমরা ফিরে যাই (৭০-৮০ দশকের দিকে ) সংবাদপত্র মানে সমাজ ও রাষ্ট্রের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করতো। রাষ্ট্রের চর্তুথ স্তম্ভ বললেও অবস্থান ছিলো সবার উর্ধ্বে, কারণ সমাজ ও রাষ্ট্রের আলোকরশ্মি হয়ে রাজনৈতিক থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর পটপরিবর্তনের একটা অঙ্গিকারের রূপরেখার আলোক সজ্জিত হিসেবে প্রাধান্য পেতো। সংবাদপত্রে কর্মরত মানুষ গুলো ছিলো সমাজ রাষ্ট্রের বিবেক আলোকিত একটা প্রতিচ্ছবি, যাকে সহজসরল ভাষায় সমাজ দর্পণ বলে থাকি। কিন্তু আজ নির্লজ্জের মত দাঁড়িয়ে থাকা ভিক্ষুকের চাইতেও গণমাধ্যম নামক পেশাটা কলঙ্কিত করে ফেলছি। অবশ্য এর জন্য দায়ী গণমাধ্যম সংগঠনের নামধারী স্বার্থ লোভী নেতারা ও সংবাদপত্রের কিছু সম্পাদকরা। সংবাদপত্রের মালিক সম্পাদকরা স্বার্থ লোভী নেতাদের সাথে আঁতাত করে ক্ষমতায় থাকায় যে কোন সরকারের দালালী করে ফায়দা লুটে তাদের আখের গুছানি গুছিয়ে নেয়, আর বঞ্চিত হয় সাধারণ সংবাদকর্মীরা। এতেও ক্ষান্ত হননি নেতারা, ১৯৯৫ এর পর থেকে গণমাধ্যম আইন সংশোধনের নামে একাধিকবার সংযোজন বিয়োজন পরিবর্তনের দোহায় দিয়ে বর্তমানে সাংবাদিকদেরকে মালিক পক্ষের দাস বানিয়ে দিয়েছে। আগে মালিক পক্ষ গণমাধ্যম আইনকে তোষামোদ করে চলতো এখন তাঁর হিতে বিপরীত উল্টো সাংবাদিকরা চাকুরি রক্ষার্থে সম্পাদক / মালিকের পা’চাটা হয়ে কাজ করতে হয়। এদিকে গণমাধ্যম আইনকে খর্ব করে সাংবাদিক পেশাকে শ্রমিক বানানো হয়েছিলো আজ একই নিতান্তে “প্রস্তাবিত গণমাধ্যম আইন -২০২১” গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাথে তুলনা করা হয়। বিদ্যমান আইনে কোন ব্যবধান রাখা হয়নি। ১৩ নাম্বার পয়েন্টে বিদ্যমান আইনে মালিকের সাথে দরকষাকষি, সভা, সমাবেশ করার অধিকার থাকলেও প্রস্তাবিত গণমাধ্যম আইনে তা রাখা হয়নি, বরং মালিকের অনুমতি ছাড়া সভা সমাবেশে যোগ দিল ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, ৬ মাসের জেলের বিধান রাখা হয়েছে –। কেন্দ্রীয় নেতাদের ভূমিকা ছিলো বালিশ কাতান। অবশ্য প্রস্তাবিত গণমাধ্যম আইন -২০২১ এই আইনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করে ইউনিয়নের বাহিরে থাকা চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্ন ৪২ জন সংবাদকর্মীরা প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেন। তারপর গুম ভাঙে কেন্দ্রীয় নেতাদের। এবার প্রশ্ন হলো যাঁরা মুলধারার সাংবাদিক বলে জাহির করেন তাঁরা সেদিন কোথায় ছিলেন। সত্যি কথা বলতে কি নিজের ফায়দা লুটা ও স্বার্থপরতাকে বড় করে দেখতে গিয়ে সাংবাদিক পেশাটাকে খরগোশের পায়ের গোড়ায় নামিয়েছে।
লেখক -সাংবাদিক ও কলামিস্ট।