দখল বাণিজ্যে হারিয়ে গেছে নান্দনিক শহর চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ৮:৩০ অপরাহ্ণ , সেপ্টেম্বর ৩, ২০২২

কামাল পারভেজ

চট্টগ্রাম হচ্ছে দেশের অন্যতম দ্বিতীয় বাণিজ্যিক রাজধানী। এবং যাকে একসময় প্রাচ্যের রাণীর শহর বলা হতো, যার কারণ নান্দনিকতার রুপে পুরো চট্টগ্রাম স্বপ্নের রাজ্যে থাকতো ব্রিটিশ রমণীদের দুই আঁখিতে। ব্রিটিশ সৈন্যরা পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসলে সহজেই তাঁরা ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে চাইতো না। জাহাজ নিয়ে সাগর পথে পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম বঙ্গব সাগরে জাহাজ ভিড়লেই যে ঘাট দিয়ে আসুক না কেন সবুজে ঘের নান্দনিকতার ছোঁয়ায় মনোমুগ্ধকর হয়ে উপভোগ করতো। তাইতো কবি কাজী নজরুল ইসলাম চাটিগাঁয় এসে সীতাপাহাড়ে অবলোকন করতে গিয়ে লিখেছেন –
আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই।
ওই পাহাড়ের ঝর্ণা আমি,
উধাও হ’য়ে বই গো, উধাও হ’য়ে বই।।
পাহাড় ঘুমায় ওই।
আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই।
চিতা বাঘ মিতা আমার গোখ্রো খেলার সাথি
সাপের ঝাঁপি বুকে ধ’রে সুখে কাটাই রাতি
ঘুর্ণি হাওয়ার উড়িন ধ’রে
নাচি তাথৈ থৈ ও আমি
নাচি তাথৈ থৈ।।
পাহাড় ঘুমায় ওই!!
এ চট্টগ্রামের রয়েছে হাজার বছরের পুরাতন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বারো আউলিয়ার পুণ্যভূমি, প্রাচ্যের রাণী বীর প্রসবিনী, আধ্যাত্মিক রাজধানী, বন্দরনগরী, আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী, কল্যাণময় নগরী এমন অসংখ্য নামে পরিচিত এই চট্টগ্রাম।
ইতিহাস যা বলে শিলালিপিতে লেখা হয় চেৎ‌-ত-গৌঙ্গ যার অর্থ হলো ‘যুদ্ধ করা অনুচিৎ’। আরাকানী পুঁথি থেকে জানা যায় এরপর থেকে এই এলাকার নাম হয় চেত্তগৌং। কালক্রমে চেত্তগৌং থেকে চাটিগ্রাম, চাটগাঁ, চট্টগ্রাম, চিটাগাং নামের উৎপত্তি। ব্রিটিশরা তখনকার সময় আধুনিক শহর গড়তে তাদের পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম প্রথম মিউনিসিপ্যালিটি গঠিত হয় ১৮৬৩ সালের ২২ জুন এবং ১৯৭৭ সালের ২৯ জুন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটির নাম পরিবর্তিত করে ‘চট্টগ্রাম পৌরসভা’ নামকরণ করা হয়।
১৯৯০ সালের ৩১ জুলাই পৌরসভাকে উন্নীতকরণের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হয়।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এর ইতিহাস প্রায় ১৫৮ বছরের পুরনো। ১৯৯০ সালের পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার প্রায় ১২৭ বছর আগে এ অঞ্চলের প্রাচীনতম পৌরসভা চট্টগ্রাম পৌরসভা বা চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটি’ গঠিত হয়। পুরো চট্টগ্রামের কয়েক লাইনে সংক্ষিপ্তভাবে ইতিহাস তুলে ধরার কারণ হলো বর্তমান যতটুকু পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের অধিনস্হ এরিয়া রয়েছে সে দিক থেকেও যদি আমরা পেছনের দিকে ফিরে তাকাই ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সৈন্যরা বিতাড়িত হয়ে বিদায় নেওয়া পর পাকিস্তান শাসন আমল ১৯৭১ সাল অব্দি পর্যন্ত এবং ১৯৬১ পাকিস্তান পরিকল্পনা জরিপ ম্যাপে/ খতিয়ান সুত্র মতে এই শহরে ৭১টির মতো খাল ছিলো, প্রায় ১১০০ ( এগারো শত) এর অধিক পুকুর ও বড় বড় ১০টির মতো দিঘি ছিলো। যা থেকে এখনো প্রমাণ করে রেলওয়ে পাহাড়তলী দিঘি, আগ্রাবাদ ডেবা, আসকারপার দিঘি, দেওয়ানযী দিঘি, ইপিজেড কলসিদিঘি, বড়দিঘির পাড়, শেরশাহ দিঘি, খন্দকিয়াহাট দিঘি। বিগত ৫১ বছরে হারিয়ে গেছে এসব খাল,পুকুর, দিঘি। যেসব খালে চলতো ছোট ছোট নৌকা চাক্তাই খাতুনগন্জ থেকে পন্য নিয়ে এই শহরে অলি গলিত পৌঁছে যেতো। মাঝিদের ডিঙি নৌকার পালে অপরুপ দৃশ্য উপভোগ করতো ব্রিটিশ রমণীরা, তাঁর সাথে চাটিগাঁ নারীর ঘাটে উঁকি মারার দৃশ্যে মাঝির সারি সারি গানের মনহরা কঙ্কাবতীরা মাঝিদের সাথে নতুন জীবনানন্দের বাসগৃহে প্রবেশ করতো। কালের স্বাক্ষী আজ বিবর্তনের পরিক্রমায় বিলীন হয়ে গেছে। একদিকে ইতিহাস ঐতিহ্য ও চাটিগাঁর সংস্কৃতি বিলীন হয়ে পড়ে অন্যদিকে অপরাজনৈতিকের পরিচর্যার সংস্কৃতির করাল গ্রাসে চাটিগাঁও শ্রীহীন ও নিন্দিত শহরে ঠেক বেঁধেছে। বাঁচার আকুতি আর্তচিৎকারের কান্না এই বিবেকহীনতার কাছে পরাজিত হয়ে মৃত্যুটাকেই আপন করে নিলো এই প্রাচীন নানন্দিকতার শহর। তিল পরিমান জায়গাটুকুকেও গিলে খেলো রাজনৈতিক অকমন্ডরা। ধর্মের দোহায় আর শিক্ষার আলোর প্রদীপশিখা জ্বালাতে ক্ষুধার্তের মতো খাল গুলো দখল করে শিক্ষা বাণিজ্য করতে বিন্দুমাত্র দিদা বোধ করেনি। নগর পিতা দাবির আড়ালেই নগরায়নের সৌন্দর্যের নামে গিলে খেয়েছে পুরো শহরকে। মনে হয় যেনো চারশত মিটারের দৌড় প্রতিযোগিতাকেও হার মানিয়ে দিয়েছে অকর্মা দখলবাজ রাজনৈতিক ভূমিদস্যুরা। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আজ একমাত্র বেঁচে থাকার ফুসফুস সিআরবিকেও গ্রাস করতে কুণ্ঠাবোধে বিবেকে বাঁধেনি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকেও যদি তাকাই দেখতে পাই তাঁরা ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি সংরক্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আর আমরা ধ্বংসের দিকে এক নাম্বারে আছি। যাদুঘরে থাকা পুরোনো স্মৃতি সম্পদ ও ভুতত্ত গুলো রক্ষকরাই ভক্ষক হয়ে চুরি করে বাহিরের দেশে বিক্রি করে দেয়, সেখানে বিবেকতো মরে গেছে অনেক আগেই। খাল গুলো মৃতু করে পুকুরের উপর বিশাল বিশাল দালান কোঠা, দিঘি গুলো ভরাট করে আবাসিক এলাকায় পরিনত হয়েছে। খেলার মাঠে নার্সারির ব্যবসার নামে দখল করে শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আশি দশকের পর থেকে শুরু হয় দখল বাণিজ্য, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রভাব বিস্তারে সাঙ্গপাঙ্গরাও বাদ যায়নি দখল বাণিজ্যে। যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসে পালাবদল যেমনটিতে তেমনি হাতবদল বাণিজ্য করে নিয়েছে। ভূমিদস্যুরাও মাথা চড়া দিয়ে সরকারি হর্তাকর্তা কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সরকারি জায়গাকে নামে বে-নামে কাগজে কলমে দখল নিয়েছে। পুরনো জমিদার বাড়িগুলো এ-সব রাজনৈতিক ভূমিদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। চেষ্টা চালিয়েছিলো পরির পাহাড় খ্যাত পুরনো আদালত ভবনটা ভেঙে ফেলতে। রাজনৈতিক নেতাদের একটা রাজনীতির মোটা অংকের রফাদফার নামে ঠিকাদারি হবে, এ আশা ভেঙে দিলো সাধারণ জনতার প্রতিবাদে। চট্টগ্রাম শহরের ভিতর থাকা নান্দনিক ছোট ছোট পাহাড় গুলো গিলে খেয়েছে, এখন আশেপাশের বেষ্টনীতে অপরুপ দৃশ্যের পাহাড়গুলো বিলীন করে ফেলছে। এমনকি দখল করতে করতে সড়কের পাশে জনগণ হাটার ফুটপাতও দখল করে টঙ্ক চায়ের দোকান বসিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা দৈনিক /মাসিক মাসোহারা নিচ্ছে। প্রতিবাদের ভাষায় উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হয়। যেমন কাজীর দেউরীর আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিংপুলের নামে বাণিজ্য করে ফয়দা লুটে নিলো লোভী নেতারা। বর্তমানে একরকম সুইমিংপুলে শেওলায় গ্রাস করছে। ঐদিকে মাঠের সৌন্দর্য যেমন হারিয়েছে তেমনি খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হলো আমাদের সন্তানেরা। আজ পরিবেশও পরিস্থিতির মোকাবিলা থেকে অনেক দূরে। এখন চাটিগাঁও ধু-ধু ধুলো বালির শহর নামে পরিচিত লাভ করেছে। অরণ্যর ছোঁয়া পেতে হলে যেতে হবে পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই ভূমিদস্যু ও দখলবাজদের কি কখনোই বিচার হবেনা, আর আমরাও কি সেই প্রাচীন নানন্দিকতার শহর ফিরে পাবোনা।
লেখক :- সাংবাদিক ও কলামিস্ট।