দেশভাগ এবং একটি হত্যা

প্রকাশিত: ১:৪৭ অপরাহ্ণ , আগস্ট ১৪, ২০২২

তাপস দাস

এ শতাব্দীতে দুজন শ্রেষ্ঠ বাঙালির নাম বাঙালির জনমানসে বাস্তব হয়ে থাকবে। একজন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্য একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একজন বাংলা ভাষাকে বৈশ্বিক রূপ দিয়েছিলেন। যার গান বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। অন্যজন বাঙালির অনেক বছরের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন, সৃষ্টিতে সহায়তা করেছিলেন এ জাতির জন্য স্বাধীন এক ভূখণ্ড, যার নাম বাংলাদেশ।

আর সেই কারণেই অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন-
“যতদিন রবে পদ্মা-মেঘনা-গৌরি-যমুনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”

১৯৪৭ সালের ৩ জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলী হাউস অফ কমন্সে ভারত ভাগের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। এটলী বলেন, ভারতকে অখণ্ড রাখার জন্য ক্যাবিনেট মিশন যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ভারতের নেতারা যেহেতু তা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, দেশ ভাগ তাই হয়ে দাঁড়াল অনিবার্য বিকল্প।

এর ফলস্বরূপ ১৯৪৭-এর দেশভাগ। ১৯৪৭ সালের দ্বি-জাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে যে দেশভাগ হয়েছিল, তা জন্ম দিয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের। কিন্তু দেশভাগের মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে দ্বি-জাতি তত্ত্বের অসারতাকে প্রমাণ করে দক্ষিণ এশিয়া তথা পৃথিবীর মানচিত্রে ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ নামক আরেকটি রাষ্ট্র।
তবে এই দুটি ভাগের ক্ষেত্রেই যে ব্যক্তিটি ছাত্র-যুবদের একত্রিত করতে গুরুত্ব ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসকরা ভারতবর্ষ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে মুসলিম লীগের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ধর্মভিত্তিক কৃত্রিম পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ইসলামকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করে পূর্ববাংলার ওপর পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃত্বের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক আঘাত নেমে আসে। এই আঘাত সর্বপ্রথম নেমে এসেছিল তৎকালীন সাড়ে চার কোটি বাংলাভাষী মানুষের বিরুদ্ধে অর্থাৎ তাদের মাতৃভাষার বিরুদ্ধে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানকে সমর্থন করার ভুলটিকে বুঝতে পেরেই বাকি ২৪ বছর নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন পূর্ব বাংলার মানুষদের জন্য, এর ফলস্বরূপ পূর্ব বাংলার তাজউদ্দীন আহমেদ, তোফায়েল আহমেদ, বাম ছাত্র সংগঠনসহ পূর্ববাংলার আপামর জনগণকে নিয়ে শেখ মুজিব তার পুরোনো একটি ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন বাংলাদেশ গঠনের মধ্যে দিয়ে। এক্ষেত্রে বলে রাখা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের উত্থানের পিছিনে যে শুধুমাত্র শেখ মুজিবুরের বিশেষ অবদান ছিল তা আমি বিশ্বাস করিনা, তবে একথা অস্বীকার করার জায়গা নেই বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন এবং তার নীলনকশা যিনি তৈরি করেছিলেন তিনি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এখানেই অন্যদের থেকে তিনি অনন্য।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী শেখ মুজিবের প্রদর্শিত পথকে পাথেয় করে তাজউদ্দীন আহমেদসহ অন্যান্য নেতৃত্বের সাহায্যে ৩০ লক্ষ শহীদ এবং প্রায় ৩ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশ গড়ে উঠেছিল ২৪ বছরের পরাধীনতার থেকে মুক্ত হতে। এই পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত হয়ে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সাংবিধানিকভাবে সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তাদের জাতির পিতার হত্যা বাকি ৪৭ বছরকে ঠেলে দিয়েছিল এক অন্ধকারময় জগতে।

একথা ঠিক ৫০ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকসহ মানব উন্নয়নের বিভিন্ন খাতে যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করেছে, কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশ কি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পেরেছে? আমার উত্তর- না।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের আজ অর্থনৈতিকভাবে একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ দেশ, শেখ মুজিবুর রহমান হয়তো এটাই চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে শুধু দেশের একাংশের উন্নয়ন চাননি, তিনি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন ‘গরীবের সমাজতন্ত্র’, কিন্তু আজ বাংলাদেশে ধনী-গরীবের পার্থক্য বাড়ছে, তা নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধু প্রদর্শিত পথ তা বলা যায় না। আজ ৫০ বছর পরও ধর্মীও সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশে যেভাবে অত্যাচারিত হচ্ছে।

এই বাংলাদেশ তিনি গড়ে তোলার কথা বলেননি, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ ছিল ধর্মনিরপেক্ষ, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় রাষ্ট্রের কোনো ধর্মের কথা বলা হয়নি। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম। প্রতি পদে পদে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু ও ইসলামের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা। একথা ঠিক, তিনি ব্যক্তি জীবনে হয়তো ইসলামের উপাসক ছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্তরে তিনি সবসময় ধর্মের সঙ্গে একটি ব্যবধানের কথা বলে গেছেন। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি করার জন্য তৈরি করেননি, তার উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ধর্মকে আধুনিকতার আলোকে আলোকিত করা। কিন্তু আজকের বাংলাদেশ অন্য কথা বলে।

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টের পর থেকেই ধীরে ধীরে এইভাবেই পথভ্রষ্ট হয়েছিল। তৎকালীন সময় দাঁড়িয়ে তার বিরোধীরা হয়তো ভেবেছিল তাঁকে হত্যার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করবে। কিন্তু আজ আমি নিশ্চিত মেজর ফারুক, ডালিমসহ যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল, শুধুমাত্র দেশ নয়, এই উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কতটা ক্ষতি তারা করেছে! আসলে, এই হত্যার পিছনে ছিল তার হত্যার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিজস্ব স্বার্থ।

উদাহরণ টেনে বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর একসময়ের রাজনৈতিক কর্মী খোন্দকার মোশতাকের কথা, যিনি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব না দেওয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুজিব হত্যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে। জেনারেল জিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষের খারাপ চেয়ে কোনো কাজ করেননি। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাষ্ট্রীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়তো মুজিব বেশকিছু প্রতিকূল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন, তবে তাঁর মতো দূরদর্শী সম্পন্ন রাজনীতিবিদকে বোঝার জন্য কিছুটা সময় দরকার ছিল, কারণ পূর্ববাংলাকে তাঁর মতো খুব কম ব্যক্তিই বুঝতো বলে আমার মনে হয়। কারণ সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি পূর্ববাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত চষে বেড়িয়েছেন। পূর্ববাংলার মুক্তির জন্য জীবনের ১৩ থেকে ১৪ বছর তাঁকে অতিবাহিত করতে হয়েছে কারাগারে।

স্মরণীয় যে মানুষটি ১৯৬৬ সালে জেলে বসে লিখেছিল, এই বাংলায় সবসময় বিশ্বাসঘাতক জন্মেছে, ভবিষ্যতেও জন্মাবে। তার এই ভবিষ্যৎবাণী যে নিজের ভবিষ্যতেও পরখ করতে হবে তা হয়তো তিনি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেননি। তাই মৃত্যুর আগমুহূর্তে নিজের সেনাবাহিনীর হাতে বন্দুক দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। তবে এই ঘটনা প্রমাণ করে, তিনি তার দেশের মানুষকে কতটা বিশ্বাস করতেন। কোনো বাঙালি তাকে হত্যা করতে পারে সেটি ছিল তার কাছে অবিশ্বাস্য। শেখ মুজিবুর রহমান নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, সেটা অস্বীকার করার জায়গা নেই, তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট তার হত্যা বাংলাদেশকে অন্য খাতে বয়ে নিয়ে যায়।

সুতরাং, ৪৭ বছর আগে সেদিনের বিশ্বাসঘাতকরা শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, সেদিন কবরস্থ করা হয়েছিল গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী, সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন।

লেখক: বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষক, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা