- যুগান্তর -

বন্ধ হচ্ছে না ‘বেপরোয়া’ এমপিদের বাড়াবাড়ি

প্রকাশিত: ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ , জুলাই ১৬, ২০২২

কেন্দ্রের কঠোর নির্দেশনার পরেও বন্ধ হচ্ছে না ক্ষমতাসীন দলের এমপিদের বাড়াবাড়ি। প্রকাশ্যে মারধর, স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, হুমকি-ধমকি দিয়ে প্রায়ই শিরোনাম হচ্ছেন ‘বেপরোয়া’ সংসদ-সদস্যরা।

এছাড়া ক্ষমতার প্রভাব, খবরদারি, দলাদলি, তৃণমূল নেতাকর্মীদের অবহেলা, নির্বাচনি এলাকায় নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে নিজস্ব বলয় তৈরি করার অভিযোগও রয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দলের অভ্যন্তরে বিরোধ সৃষ্টি, টেন্ডার এবং বিভিন্ন কাজে হস্তক্ষেপের মতো বাড়াবাড়ির ঘটনা ঘটাচ্ছেন তারা।

সংসদ-সদস্যদের একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছে ক্ষমতাসীন দল। এতে দলের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি হ্রাস পাচ্ছে গ্রহণযোগ্যতাও। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মতে, ব্যক্তির অপকর্মের কারণে দল অভিযুক্ত হবে, এটা কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক শুক্রবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সবাইকে অবশ্যই আইনের শাসনের মধ্যে থাকতে হবে।

আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। একজন সংসদ-সদস্যকে এ বিষয়ে আরও বেশি সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। কেউই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। নির্বাচনের আগে এ ধরনের ঘটনাগুলো দলের জন্য বিব্রতকর কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আসলে নির্বাচনের বিষয় নয়।

আওয়ামী লীগ জনগণের রাজনৈতিক দল। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। ফলে সে যেই হোক না কেন, কেউই চাইলেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম যুগান্তরকে বলেন, যে যেখানেই অপকর্ম করবে, তার দায় নিজেকেই বহন করতে হবে। কোনো ব্যক্তির দায় আওয়ামী লীগ বহন করবে না।

কারও বিরুদ্ধে দলীয় নিয়মশৃঙ্খলাবহির্ভূত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে দলীয়ভাবেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে ছাড় দেওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি আরও বলেন, জনপ্রিয় ও জনবান্ধব রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগ জনগণের পাশে আছে, পাশে থাকবে।

কারও ব্যক্তি পাপের কারণে দলকে অভিযুক্ত করা যাবে না। এই দায় তাকেই মোচন করতে হবে। অন্যায় করলে তার প্রাপ্য তাকেই ভোগ করতে হবে। কোনো ব্যক্তির অপকর্মের কারণে দল অভিযুক্ত হবে, এটা কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

রাজশাহী-১ আসনের (গোদাগাড়ী-তানোর) এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে এক অধ্যক্ষকে মারধরের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ৭ জুলাই সন্ধ্যার পর এমপি ওমর ফরুক চৌধুরী তার কার্যালয়ে গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে প্রকাশ্যে কিল-ঘুসি মারেন এবং হকিস্টিক দিয়ে পেটান।

এ ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পরে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। শিক্ষক সংগঠনসহ বিভিন্ন মহল থেকে এমপি ফারুকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার দাবি ওঠে। আওয়ামী লীগ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারাও এ ঘটনায় বিব্রত। যদিও এ ঘটনার পর বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওমর ফারুক চৌধুরী।

তিনি দাবি করেছেন, তাকে ঘিরে বারবার চক্রান্ত হচ্ছে। এর আগে গণমাধ্যমে মারধরের কথা বললেও ওই সংবাদ সম্মেলনে এমপির পাশে বসে অধ্যক্ষ সেলিম রেজাও দাবি করেন-গণমাধ্যমে যে খবর বের হয়েছে, তা সত্যি নয়। এমপি তাকে মারধর করেননি।

২১ মে বরগুনার পাথরঘাটায় হরিণঘাটা বাজারসংলগ্ন স্লুইসঘাট এলাকায় সালিশি বৈঠক ডেকে এক মাছ ব্যবসায়ীকে চড়-থাপ্পড় মেরেছেন স্থানীয় সংসদ-সদস্য শওকত হাচানুর রহমান রিমন। ফোরকান মিয়া নামের ওই মাছ ব্যবসায়ী বাকিতে সিগারেট না পেয়ে মারধর করেছিলেন এক দোকানিকে।

এ ঘটনায় নালিশ পেয়ে সালিশ ডাকেন এমপি রিমন। এরপর শাস্তি হিসাবে নিজেই চড়-থাপ্পড় দেন অভিযুক্ত ফোরকানকে। ফোরকানের অভিযোগ, তিনি বরগুনার সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সুলতানা নাদিরার সমর্থক। এমপি নাদিরার সমর্থক হওয়ার কারণেই তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে মেরেছেন এমপি রিমন।

এমপি নাদিরার বাড়িও পাথরঘাটায়। এর আগেও স্থানীয় এক মাছ ব্যবসায়ী ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, একজন নারী আইনজীবীসহ একাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগ রয়েছে এমপি রিমনের বিরুদ্ধে।

এদিকে এমপি রিমন মারধরের কথা স্বীকার করে সে সময়ে গণমাধ্যমকে বলেন, একজন মসজিদের ইমামের শরীরে হাত দিয়ে ফোরকান গুরুতর অন্যায় করেছে। মুসল্লিদের চাপের মুখে এই সালিশ করতে বাধ্য হয়েছি।

তিনি বলেন, সামাজিকভাবে যতটুকু পারি, ততটুকু সালিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি। তবে পাথরঘাটায় যা ঘটে, তার চেয়ে বেশি রটায় আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।

১৯ মে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ সরকারি মাহতাব উদ্দীন কলেজের দুই সহকারী অধ্যাপককে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ-সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারের বিরুদ্ধে।

লাঞ্ছিত দুই শিক্ষক হলেন-কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন ও গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেন। শিক্ষক পেটানোর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জেলাজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

এ নিয়ে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন সরকারি মাহতাব উদ্দিন কলেজের অধ্যক্ষ ড. মাহাবুবুর রহমান।

অভিযোগে বলা হয়, বৃহস্পতিবার বিকালে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ-সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার কলেজে প্রবেশ করে গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসাইনকে ‘তুই শিবির করিস’ বলে কানে-মুখে চড়-থাপ্পড় মারতে থাকেন। শিক্ষকদের কমন রুমে নানা রকম হুমকি-ধমকি দিয়ে চলে যান।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক যুগান্তরকে বলেন, এগুলো আমাদের সমাজের সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের যারা প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই দলের জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে এগুলো আশা করা যায় না।

তাদের উচিত ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। তিনি আরও বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কিভাবে শিক্ষক ও মানুষকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতেন তার নিদর্শন আমরা তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে দেখতে পাই। সুতরাং আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত আছে, সেই দৃষ্টান্ত আমাদের অনুসরণ করা দরকার।

এই তালিকায় প্রথমইে থাকার কথা বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের যারা আছেন তাদের নাম। ৯ সেপ্টম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় এমপিদের ‘বাড়াবাড়ি’ না করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশেষ করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে সংসদ-সদস্যদের ‘খবরদারি’ না করতে বলেছিলেন তিনি। পাশাপাশি দলের ভেতরে গ্রুপিং বা উপদল তৈরি না করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন দলীয় প্রধান। তবে দলের এমন নির্দেশনাও হরহামেশাই অমান্য করছেন আওয়ামী লীগের অনেক এমপি।

তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে নিজের লোকদের দিয়ে গঠন করেন কমিটি। যা অনেক জায়গায় স্থানীয়ভাবে ‘এমপি লীগ’ নামে পরিচিত।