মুসলিমদের ওপর পুলিশের নিষ্ঠুরতা

যে ভিডিও ভারতকে নাড়া দিয়েছে

প্রকাশিত: ৯:২৫ পূর্বাহ্ণ , জুন ১৯, ২০২২

ভারতীয় পুলিশ তাদের হেফাজতে থাকা একদল মুসলিম পুরুষকে বেদম প্রহার করছে, এরকম একটি ভিডিও অনলাইনে দেখেছেন লাখ লাখ মানুষ। ভিডিওটি শেয়ার করেছেন ক্ষমতাসীন বিজেপির এক নির্বাচিত জন-প্রতিনিধি, যিনি পুলিশের নিষ্ঠুর আচরণের প্রশংসা করেন এই বলে যে, এই পিটুনি আসলে এসব লোকের জন্য একটি ‘উপহার।’
এ ঘটনায় জড়িত অফিসারদের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পিটুনির শিকার মানুষগুলোর পরিবার বলছে, তাদের প্রিয়জনরা নির্দোষ এবং তাদের মুক্তি দেয়া উচিৎ। ‘এটা আমার ভাই, ওকে প্রচণ্ড মেরেছে ওরা, ও ব্যথায় অনেক চিৎকার করছিল,’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন জেবা। যে হাতে ধরা মোবাইল ফোনে তিনি তার ছোট ভাই সাইফকে মারার এই ভয়ঙ্কর ভিডিওটি দেখছিলেন, তার সেই হাতটি কাঁপছিল। ‘এ দৃশ্যের দিকে আমি তাকাতে পারছি না। ওকে যে কী সাঙ্ঘাতিকভাবে মেরেছে,’ বলছিলেন তিনি। উত্তর ভারতের শহর সাহারানপুরে নিজের বাড়িতে এসময় তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন আত্মীয়-স্বজনরা। বিচলিত হওয়ার মতো ভিডিওটিতে দেখা যায়, কিছু ভারতীয় পুলিশ তাদের হাতে বন্দি কয়েকজন মুসলিম পুরুষকে মারতে উদ্যত, যার মধ্যে জেবা’র ভাইও রয়েছে।
ভিডিওতে আরো দেখা যায়, পুলিশ অফিসাররা এসব লোককে রড দিয়ে পেটাচ্ছে, রডগুলো তারা বেসবল ব্যাটের মতো করে ঘোরাচ্ছে। প্রতিবার যখন কারো ওপর এরকম রডের বাড়ি পড়ছে, তখন তার শব্দ শোনা যাচ্ছে, এরপরই শোনা যাচ্ছে চিৎকার। ‘খুব ব্যথা লাগছে, খুব ব্যথা লাগছে …আর মেরো না,’ আতঙ্কে-ভয়ে এক কোণায় দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকা কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়। কিন্তু এরপরও যখন বেদম প্রহার চলতে থাকে, তখন সবুজ রঙের টি-শার্ট পরা এক লোককে তার হাত জোড়া করে প্রার্থনা করতে দেখা যায়। আর সাদা শার্ট পরা সাইফকে দেখা যায় ওপরে দুই হাত তুলতে, যেন সে আত্মসমর্পণ করছে।
গত সপ্তাহে পুলিশ যে কয়েক ডজন মুসলিম পুরুষকে ধরে নিয়ে আটকে রেখেছিল, ২৪-বছর বয়সী সাইফ তাদের একজন। ভারতে ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র নূপুর শর্মা মহানবী (স.) সম্পর্কে উস্কানিমূলক কিছু মন্তব্য করার পর দেশজুড়ে যে প্রতিবাদ শুরু হয়, সাহারানপুরেও শুক্রবার মসজিদে জুমার নামাজের পর সেরকম বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। সাহারানপুরের এ প্রতিবাদ ছিল মোটামুটি শান্তিপূর্ণ, মসজিদ থেকে বেরিয়ে লোকজন শহরের দোকানপাটের সামনে দিয়ে মিছিল করে যায়।
তবে উত্তেজনা যখন বাড়ছিল, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মালিকানাধীন কিছু দোকানে হামলা হয় এবং দু’জন ব্যবসায়ী সামান্য আহত হন। জনতাকে ছত্র-ভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠি চালায়। পুলিশের কাগজপত্রে অভিযোগ করা হয় যে, সাইফ এবং আরো ৩০ ব্যক্তি মিলে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করেছে, সহিংসতায় উস্কানি দিয়েছে, একজন সরকারি কর্মচারীর কাজে বাধা দিতে ইচ্ছেকৃতভাবে তাকে আহত করেছে এবং জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। সাইফের পরিবার কার্ডবোর্ড বিক্রি করে কোনোরকমে জীবন চালায়। তারা বলছে, সাইফ নির্দোষ, এমনকি সে ঐ বিক্ষোভেও পর্যন্ত ছিল না।
তারা জানায়, সাইফ শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটার দিকে ঘর থেকে বেরিয়েছিল তার এক বন্ধুর জন্য বাসের টিকেট কাটতে। তখন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে এবং সাহারানপুরের কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যায়। জেবা যখন তাকে থানায় দেখতে যান, তখন তার ভাইয়ের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন বলে জানান, ‘বেদম পিটুনির ব্যথায় তার শরীর নীল হয়ে গিয়েছিল ও ঠিকমত বসতে পর্যন্ত পারছিল না।’ এই ভিডিও, যাতে স্পষ্টভাবেই পুলিশের নৃশংসতা দেখা যাচ্ছে, সেটি অনলাইনে শেয়ার করেন বিজেপির এক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শালাভ ত্রিপাঠি। ভিডিওর নীচে তিনি আবার ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘বিদ্রোহীদের জন্য একটি ফিরতি উপহার।’ ভিডিওটি অনলাইনে ভাইরাল হয়।
ত্রিপাঠি ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এক রাজনীতিক এবং উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সাবেক মিডিয়া উপদেষ্টা। ঘটনাটি ঘটেছে এ প্রদেশেই। বিজেপির পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এই ভিডিওর ঘটনার কোন নিন্দা করা হয়নি, বিজেপি সরকারের তরফ থেকেও নয়। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, ভারতে ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেখানে পরিবেশ ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিমদের টার্গেট করে ঘৃণা-বিদ্বেষপূর্ণ কথাবার্তা বাড়ছে, বাড়ছে তাদের টার্গেট করে হামলার ঘটনা।
বিবিসি এ পর্যন্ত আধা ডজন মুসলিম পরিবারের সাক্ষ্য নিয়েছে যারা বলছে, গত শুক্রবার সাহারানপুরে তাদের আত্মীয়-স্বজনকে গ্রেফতারের পর কোতোয়ালি থানায় পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারধর করা হয়েছে। এরা ভিডিওতে তাদের নিকটজনকে চিহ্নিতও করেছেন, যাতে দেখা যায় পুলিশ সহিংসতা চালাচ্ছে। অন্য ফুটেজে দেখা যায়, এসব লোককে একটি ভ্যানে তুলে অন্য একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ দৃশ্যে কোতোয়ালি থানার সাইনবোর্ড স্পষ্টভাবেই চোখে পড়ে।
কর্মকর্তারা বলছেন, শুক্রবারের বিক্ষোভের সময় সহিংসতার অভিযোগে তারা ৮৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশের সুপারিন্টেনডেন্ট রাজেশ কুমার বিবিসিকে বলেন, কেবলমাত্র অপরাধীদেরই গ্রেফতার করা হয়েছে। ‘আমরা যখন কাউকে গ্রেফতার করি, তখন আমরা প্রথমে তারা যে কোনো সহিংস বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছিল এমন ফুটেজ তাদের দেখাই, এরপরই কেবল তাদের গ্রেফতার করা হয়,’ বলছেন তিনি। তবে তার এ কথার সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছে এমন কিছু লোকের পরিবারের কাছ থেকে আমরা যে বিবরণ শুনেছি, তা মিলছে না।
পুলিশের থানায় যখন এসব ঘটনা ঘটছে, তখন শহরের অন্যদিকে আইনের জোর অন্যভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে- বুলডোজার দিয়ে দু’জন মুসলিম পুরুষের বাড়ির অর্ধেক অংশ ভেঙে দেয়া হয়েছে। এ দু’জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা সহিংসতায় উস্কানি দিয়েছিল। ভারতে লাখ লাখ মানুষ এমন সব জোড়াতালি দেয়া ঘরবাড়িতে থাকে, যেগুলো কর্তৃপক্ষের যথাযথভাবে অনুমোদিত পরিকল্পনা ছাড়াই নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বিজেপি এখন অহরহ এ বিষয়টিকে শাস্তির একটি কারণ হিসেবে ব্যবহারের কৌশল নিয়েছে।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভে অংশ নেয়া লোকজনের অবৈধভাবে নির্মিত ঘর-বাড়ি ভেঙে দেয়ার যে নির্দেশ, তা একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন পেয়েছে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ টুইট করে জানিয়েছেন, কথিত আইন-ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে বুলডোজারের কাজ চলবে এবং শুক্রবার যে মুসলিমরা নামাজ পড়েন, তাদের প্রতি প্রচ্ছন্নভাবে ইঙ্গিত করে তার মিডিয়া উপদেষ্টা মৃত্যুঞ্জয় কুমার একটি বুলডোজারের ছবি পোস্ট করেন। এর নীচে লেখা, ‘শুক্রবারের পর শনিবার আছে কিন্তু!’ এরপর গত শনিবার বিকেলে মুসকানের বাড়িতে আসলো একটি বুলডোজার এবং বাড়ির সামনের গেট ভেঙে ফেলা শুরু করলো।
পুলিশ সেখানে এসে হাজির হলো তার ভাইয়ের এক ছবি হাতে এবং জিজ্ঞেস করলো, এই বাড়িতেই সে থাকে কিনা। ১৭-বছর বয়সী ছেলেটিকে এর আগের রাতেই পুলিশের হেফাজতে নেয়া হয়েছিল। ‘আমার বাবা নিশ্চিত করলেন যে, ছবিটি তার ছেলের এবং জিজ্ঞেস করলেন কিছু ঘটেছে কিনা,’ বলছিলেন মুসকান, ‘তারা কোনো উত্তর দিল না, হঠাৎ তারা বুলডোজার চালানো শুরু করলো।’
যোগী আদিত্যনাথের একজন উপদেষ্টা নভনীত সেহগাল বলেন, বুলডোজার দিয়ে যা করা হচ্ছে তা আইন মেনেই এবং ‘সব নিয়মে মেনেই করা হচ্ছে … এখানে আইনের বিরুদ্ধে কিছু হচ্ছে না।’ কিন্তু ভারতের একদল শীর্ষস্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞ, যাদের মধ্যে সাবেক বিচারপতি এবং নামকরা আইনজীবীরা রয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন পেশ করেছেন পুলিশের এসব মারধর এবং বুলডোজারের অনাকাঙ্খিত ব্যবহারের সর্বশেষ ঘটনাবলীর বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে। তাদের চিঠিতে তারা অভিযোগ তুলেছেন, আদিত্যনাথ পুলিশকে ‘নিষ্ঠুর এবং বেআইনিভাবে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্যাতন চালাতে’ মদত দিচ্ছেন। তারা আরোওবলেছেন, ‘সর্বশেষ এসব ঘটনা জাতির বিবেককে নাড়া দিচ্ছে।’
‘শাসকশ্রেণীর এরকম নিষ্ঠুর দমন-নিপীড়ন আইনের শাসনকে যেভাবে ধ্বংস করছে, তা মানা যায় না। এটি সংবিধান এবং রাষ্ট্র যেসব মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে, তাকে একটা পরিহাসে পরিণত করেছে,’ বলছেন তারা। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও ভারত সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে যে, তারা যে কোন ধরনের ভিন্নমতকে দমন করতে চাইছে। ‘ভারত সরকার বেছে বেছে এবং হিংস্রভাবে সেসব মুসলিমের ওপরই দমন চালাচ্ছে, যারা তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ভিন্নমত তুলে ধরছে।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় বোর্ডের প্রধান আকার প্যাটেল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিক্ষোভকারীদের মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে দমন করা, বিনা বিচারে আটকে রাখা এবং শাস্তি হিসেবে ঘরবাড়ি ভেঙে দেয়া – এগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং মানদণ্ড রক্ষা করে চলার যে অঙ্গীকার ভারত করেছে, তার পুরোপুরি লঙ্ঘন।’ সূত্র : বিবিসি বাংলা।