সিয়ামের রং ছড়াক ১২ মাসই

প্রকাশিত: ১:২০ অপরাহ্ণ , এপ্রিল ২৯, ২০২২

মো. আব্দুল করিম গাজী

সাওম বা সিয়াম আরবি শব্দ। বাংলাভাষায় ব্যবহৃত রোজা মূলত ফারসি শব্দ। যার অর্থ কোনো কিছু থেকে বিরত থাকা, পরিত্যাগ করা। রমজান মাস প্রতিটি বছর রহমত, মাগফিরাত এবং নাজাতের বার্তা নিয়ে আগমন করে প্রতিটি মুসলমানের ঘরে। সবাই রমজান মাস এলে আলাদা সুখ-প্রশান্তি অনুভব করে। যারা (সাওম) রোজা পালন করে, তারা অন্য সময় নামাজ না পড়লেও রোজা রাখলে তখন নামাজ ঠিকমতোই পড়ে। যারা পুরো বছর টুপি মাথায় দেয় না, তারাও রোজা রেখে মাথায় টুপি লাগায়; রমজানের সম্মানে। মনে হচ্ছে, এ যেন একটা জান্নাতি পরিবেশে সমবেত সবাই। আসলে রমজান মাস কেন এলো? কী তার দাবি? আল্লাহ কেন এত সম্মান দিলেন এ মাসকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন : হে ইমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী নবিদের উম্মতের ওপর। আশা করা যায় তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণ ও বৈশিষ্ট্য জাগ্রত হবে। (সূরা বাকারা : ১৮৩)। রোজা শুধু আমাদের মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত নয়; বরং এটা পূর্ববর্তী থেকে চলে আসছে।

রমজান মাসে ধনীদের মধ্য থেকে যারা রোজা রাখে তারা অনুভব করে যে, যারা অসহায়, দুস্থ, ইয়াতিম ঠিকমতো তিন বেলা খাবার খেতে পারে না। তারা যখন ক্ষুধার্ত থাকে কতটুকু কষ্ট পায়। আর এ রোজার শিক্ষা নিয়ে যারা জীবন পরিচালনা করবে, তারা পেট পুরে খাবে, আর প্রতিবেশীরা উপবাস থাকবে, এটা কখনো হবে না। গরিবদের খাদ্য প্রদানসহ সব ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করাটাই হলো মাহে রমজানের অন্যতম একটা শিক্ষা।

রোজা প্রকৃত পক্ষে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের ট্রেনিং দেয়। মানুষের মধ্যে তিনটি প্রবৃত্তি খুবই জোরাল। সে তিনটি পর্যায়ক্রমে হচ্ছে : ১) খাদ্য গ্রহণ প্রবৃত্তি ২) যৌন প্রবৃত্তি ৩) পরিশ্রমের পর বিশ্রাম প্রবৃত্তি। এ তিনটি প্রবৃত্তি হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কড়া প্রবৃত্তি। এদের যদি দমন করা যায়, তবে অন্যান্য প্রবৃত্তিগুলো সহজে দমন হয়ে যায়। আর এ প্রবৃত্তিগুলো দমন হয়, রোজার মাধ্যমে।

দিনেরবেলা খাদ্য গ্রহণ ও যৌন প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আবার রাতে এ দুটিকে ছেড়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, বিশ্রাম প্রবৃত্তিকে। কারণ রাতে তারাবি নামাজ, পড়া যা অন্য সময় নেই এবং রাতে উঠে আবার সেহরি খাওয়া যেটা অন্য কোনো সময় নেই। আর এ সবই হচ্ছে বিশ্রামকে নিয়ন্ত্রণ করা। এ নিয়ন্ত্রণের পেছনে মাত্র একটাই শক্তি কার্যকর থাকে তা হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস।

রমজান মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন : রমজান মাস, ইহাতেই কুরআন মাজিদ নাজিল হয়েছে, তা গোটা মানবজাতির জন্য জীবনযাপনের বিধান এবং তা এমন সুস্পষ্ট উপদেশাবলিতে পরিপূর্ণ যা সঠিক ও সত্য পথ প্রদর্শন করে এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য পরিষ্কার রূপে তুলে ধরে। (সূরা বাকারা-১৮৫)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, হজরত মুহাম্মাদ (সা.) ঘোষণা করেছেন, যে লোক রমজান মাসের রোজা রাখবে ইমান ও চেতনাসহকারে তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। (বুখারি-মুসলিম)। যদি আল্লাহ এবং তার রাসূলের দেখানো পথে আমরা চলি, তবে আল্লাহ অবশ্যই আমাদের সহজ, সরল পথে পরিচালিত করবে।

রমজান শেষ হয়ে গেলে আমাদের মসজিদগুলো আবার আগের মতো খালি হয়ে যায়। মানুষের আচার-আচরণ সব অস্বাভাবিক হতে থাকে। সুদ, ঘুষসহ নানা অশালীন কর্মকাণ্ড আবার চালু হয়ে যায়। এ ধরনের কার্যক্রম যদি রমজানের রোজা আমাদের বিরত না রাখতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের রোজা পরিপূর্ণ আদায় হয়নি।

শুধু নামাজ, দান, সদকা, নফল ইবাদাত, ভালো কাজ, সৎ কাজে আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ এগুলো রমজান মাসে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরোটা বছর যদি এ কাজগুলো চালু রাখি, তাহলে আমরা রমজান মাসের আলোকে জীবন গড়তে সক্ষম হব। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে রমজানের হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করার তাওফিক দিন। আমিন।